শিক্ষার জন্য এসো সেবার জন্য বেরিয়ে যাও

প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস

History
যে এলাকায় একসময় উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের দূরবর্তী শহরে ছুটতে হতো, যে এলাকার অভিভাবকরা কলেজের কথা চিন্তাই করতে পারতেন না, সেখানেই আজ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে প্রিন্সিপাল কাজী ফারুকী কলেজ। লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর উপজেলার রাখালিয়া গ্রামে এই কলেজের জন্ম শুধু ইট-পাথরের গল্প নয়, এটি একজন মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তি, কয়েকজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মীর জানপ্রাণ ঢেলে দেওয়া পরিশ্রম, একটি পরিবারের অসীম ত্যাগ এবং একটি ট্রাস্টের নিরলস অঙ্গীকারের জীবন্ত দলিল।
জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত শিক্ষাবিদ প্রফেসর কাজী মোঃ নুরুল ইসলাম ফারুকী সারাজীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে জেনেছিলেন, উচ্চ মাধ্যমিক স্তরটি হচ্ছে শিক্ষার এমন একটা স্তর যা একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের ভিত্তি তৈরি করে। যদি এই স্তরটি দুর্বল থাকে, তাহলে মেধাবী হয়েও গ্রামের শিক্ষার্থীরা জাতীয় প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে। ঢাকা কমার্স কলেজ ও বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এন্ড টেকনোলজির মতো প্রতিষ্ঠান গড়ার পর তিনি মনোযোগ ফেরালেন নিজ জন্মভূমির দিকে। ২০১০ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারি গ্রামবাসীর সঙ্গে মতবিনিময়, পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা এবং সর্বোপরি আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে এগিয়ে গেলেন।
জমির প্রয়োজন মেটাতে প্রফেসর ফারুকী তাঁর নিজের ওয়ারিশ সূত্রে প্রাপ্ত ও পূর্বে ক্রয়কৃত জমির পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের দ্বারস্থ হন। তাঁর বোন মরহুমা কাজী মাসুমা খাতুন, কাজী জমিলা খাতুন, মরহুমা কাজী মাহফুজা খাতুন এবং ভাই মরহুম কাজী মফিজুল ইসলাম কিছু জমি দান করে এগিয়ে আসেন। চাচা কাজী জয়নাল আবেদিন ও চাচাতো ভাই কাজী বদিউজ্জামানও কিছু জমি এওয়াজ দিয়ে শরিক হন। দেড় একর জমির উপর ২০১১ সালের ১৪ এপ্রিল চাচা মরহুম কাজী জয়নাল আবেদীন ও চাচাতো ভাই মরহুম কাজী সাখাওয়াতুল্লাহর মাধ্যমে ছয়তলা একাডেমিক ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। বারো কোটি টাকার প্রাক্কলিত ব্যয়ে নির্মিত এই ভবনের পুরো অর্থায়ন করেছে প্রফেসর কাজী ফারুকী কল্যাণ ট্রাস্ট।
এই নির্মাণকাজের নেপথ্যে ছিলেন দুই অসামান্য মানুষ, মিজানুর রহমান ভূঁইয়া ও কাজী ফজলুল করিম। তাঁরা শুধু নির্মাণ তদারকি করেননি, নিজেদের জীবনের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছেন এই প্রতিষ্ঠানের জন্য। সকাল-সন্ধ্যা, রোদ-বৃষ্টি, ঝড়-তুফান কোনো কিছুই তাঁদের আটকাতে পারেনি। ঘুম ভুলে, পরিবারকে সময় না দিয়ে, নিজেদের পেশাগত কাজকেও বারবার পেছনে ফেলে তাঁরা ছুটে এসেছেন ক্যাম্পাসে। ইট-বালু-সিমেন্টের হিসাব থেকে শুরু করে শ্রমিকদের খাবার-দাবার, সরকারি কাগজপত্র থেকে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে সমন্বয় সবকিছুই তাঁরা নিজ হাতে সামলেছেন। প্রফেসর ফারুকী নিজে অসুস্থ শরীরেও দিনরাত ফোনে খোঁজ নিয়েছেন, নির্দেশনা দিয়েছেন, আবার কখনো সরাসরি এসে ঘুরে দেখেছেন সবকিছু। এই তিনজনের সম্মিলিত শ্রম ও নিষ্ঠাই প্রিন্সিপাল কাজী ফারুকী স্কুল এন্ড কলেজকে একটি স্বপ্ন থেকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে।
প্রতিষ্ঠালগ্নে গঠিত বাস্তবায়ন কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন প্রফেসর কাজী ফারুকী স্বয়ং। সদস্য হিসেবে প্রফেসর আব্দুস সালাম, মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন, তানভীর আহমেদ, মিজানুর রহমান ভূঁইয়া, কাজী ফজলুল করিম, কাজী মফিজুল ইসলাম, মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম ও মোতাসিম বিল্লাহ মহিম প্রথম দিন থেকেই আন্তরিকভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১১ সালের ৩০ ডিসেম্বর সামরিক চিকিৎসা সার্ভিসেস মহাপরিদপ্তরের প্রাক্তন মহাপরিচালক লেঃ জেনারেল (অব.) ডাঃ এ কে এম জাফরউল্লাহ সিদ্দিকের প্রধান অতিথিত্বে জমকালো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির উদ্বোধন হয়। ২০১২ সালের পহেলা জানুয়ারি ২১৫ জন শিক্ষার্থী নিয়ে স্কুলের শ্রেণি কার্যক্রম শুরু হয়। একই বছরের জুলাই মাসে কলেজ কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথম অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন মোতাসিম বিল্লাহ। স্কুল ও কলেজ একই ক্যাম্পাসে, একই প্রশাসনের অধীনে, একই ইতিহাস বুকে ধরে বেড়ে উঠেছে প্রায় এক যুগ। ২০২৩ সালে শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশনা মোতাবেক কলেজ শাখাটি পৃথক সত্তা লাভ করে এবং প্রিন্সিপাল কাজী ফারুকী কলেজ নামে স্বাধীনভাবে কাজ শুরু করে। প্রথম অধ্যক্ষ মোতাসিম বিল্লাহর পর দায়িত্বে আসেন বর্তমান অধ্যক্ষ মোঃ নুরুল আমিন, যিনি ৪ বার জেলার শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছেন।
কলেজের প্রাণভোমরা এর শিক্ষকমণ্ডলী। বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা এই তিন বিভাগে দক্ষ ও অভিজ্ঞ শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে পাঠদান চলছে। এখানে ক্লাস মানে শুধু সিলেবাস শেষ করা নয়, বরং একটি সুচিন্তিত পদ্ধতির অনুসরণ। ঘণ্টাব্যাপী ক্লাসের প্রথম অংশে পূর্ববর্তী দিনের পড়া আদায়, মাঝের অংশে নতুন অধ্যায়ের পাঠদান এবং শেষ অংশে প্রশ্নোত্তর পর্ব। এর ফলে শিক্ষার্থীরা ক্লাসেই বিষয়টি আয়ত্ত করে ফেলে। যারা পিছিয়ে পড়ে, তাদের জন্য আলাদা ডিটেনশন ক্লাস ও মেকআপ ক্লাসের ব্যবস্থা রয়েছে। অভিভাবক-শিক্ষক সভা এবং পূর্বপ্রকাশিত একাডেমিক ক্যালেন্ডার পুরো শিক্ষাবর্ষকে সুসংহত রাখে। প্রতিষ্ঠানটি স্ব-অর্থায়নে পরিচালিত, রাজনীতি ও ধূমপানমুক্ত। শিক্ষকদের প্রাইভেট পড়ানো এবং শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই নীতি শিক্ষার্থীদের সম্পূর্ণরূপে শ্রেণিকক্ষমুখী করেছে।
কলেজের ভৌত অবকাঠামো শহরের যে কোনো নামী কলেজের সঙ্গে তুলনীয়। ছয়তলা একাডেমিক ভবন, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, মারহুম আসাদুল্লাহ কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, বিজ্ঞানাগার, কম্পিউটার ল্যাব সবই শিক্ষার্থীদের শেখার অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করছে। ক্রমবর্ধমান বৈদ্যুতিক চাহিদার জন্য একটি সাব-স্টেশনসহ বিশাল জেনারেটর রয়েছে। নিজস্ব পরিবহন, মানসম্পন্ন ক্যান্টিন, ছেলে ও মেয়েদের জন্য পৃথক আবাসিক হল, চিকিৎসা সেবা এবং মনোরম কেন্দ্রীয় মসজিদ ক্যাম্পাসটিকে পূর্ণাঙ্গ করে তুলেছে।
কেবল শ্রেণিকক্ষের ভেতরেই শিক্ষা সীমাবদ্ধ নেই। বিএনসিসি, স্কাউট, রোভার স্কাউট ও গার্লস গাইডের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা শৃঙ্খলা ও দেশপ্রেম শেখে। বিতর্ক, বিজ্ঞান ক্লাব, ইংলিশ লিটারেচার ক্লাব, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ক্লাব তাদের সৃজনশীলতা বিকাশের সুযোগ পায়। শিক্ষা সফর, দেয়ালিকা, বার্ষিকী ও জার্নাল প্রকাশনা, অমর একুশে গ্রন্থমেলা, পিঠা উৎসব, বিজ্ঞান মেলা, বার্ষিক ভোজ, মিলাদ মাহফিল ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি ক্যাম্পাসকে প্রাণবন্ত রাখে সারা বছর। বাংলাদেশ টেলিভিশন বিতর্ক প্রতিযোগিতায় প্রিন্সিপাল কাজী ফারুকী কলেজের বিতার্কিকরা দেশের নামিদামি কলেজকে হারিয়ে দেশজুড়ে নাম করেছে।
ফলাফলের দিক থেকে কলেজটি লক্ষ্মীপুর জেলার শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। এইচএসসি পরীক্ষায় ধারাবাহিক সাফল্যের পাশাপাশি কলেজটি জেলা পর্যায়ে একাধিকবার শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি পেয়েছে। এখান থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরা প্রতিবছরই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি মেডিকেল কলেজ, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, সামরিক বাহিনী ও মেরিন একাডেমিতে ভর্তি হচ্ছে। ঢাকা কমার্স কলেজের সঙ্গে শিক্ষা সহায়তা চুক্তি, বিইউবিটির ২৫ শতাংশ ভর্তি ছাড় এবং ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড ইউনিভার্সিটির ২০ শতাংশ ছাড় শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করেছে।
এই কলেজ নির্মাণের পেছনে যে ত্যাগের ইতিহাস রচিত হয়েছে, তার তুলনা বিরল। প্রফেসর শামসুন নাহার ফারুকী অবসরের পুরো সঞ্চয় প্রতিষ্ঠানের কাজে দিয়ে দিয়েছেন, ধানমন্ডির ফ্ল্যাট বন্ধক দিয়ে ব্যাংক ঋণ এনেছেন, বাংলাবাজারের দোকান বিক্রি করেছেন এবং শেষ পর্যন্ত ফ্ল্যাটটিও বিক্রি করেছেন যখন নির্মাণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল। প্রফেসর ফারুকীর পুত্রকন্যারা বাবার স্বপ্নকে নিজেদের জীবনের মিশনে পরিণত করেছেন, প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি সংকটে সমাধান নিয়ে হাজির হয়েছেন এবং নিরলসভাবে এগিয়ে নিয়েছেন পুরো ক্যাম্পাসকে। প্রফেসর কাজী ফারুকীর পুত্র প্রফেসর ডাঃ কাজী মোঃ নূর-উল ফেরদৌস আজ কলেজের সার্বিক কার্যক্রম তদারকি করছেন এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে গতি ও দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। মিজানুর রহমান ভূঁইয়া ও কাজী ফজলুল করিম নির্মাণকাল থেকে আজ পর্যন্ত অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন। প্রিন্সিপাল কাজী ফারুকী কলেজ আজ গ্রামীণ উচ্চশিক্ষার এক অনন্য মডেল, যেখানে প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে প্রতিদিন লেখা হচ্ছে সম্ভাবনার নতুন নতুন অধ্যায়।